সন্তান না হওয়াঃ সমস্যা ও প্রতিকার

সন্তান না হওয়াঃ সমস্যা ও প্রতিকার

পৃথিবীজুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রতি বছর প্রজনন(Fertility) সমস্যা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেন। প্রজনন অক্ষমতা (Infertility) বিশ্বজুড়ে একটি চ্যালেঞ্জ। এর মোকাবেলা করতে হবে ধীরস্থির মনোভাব নিয়ে। আপনাকে হতে হবে ধৈর্যশীল, হতে হবে সহযোগী মনোভাবপন্ন এবং সর্বোপরি  প্রজনন অক্ষমতা বিষয়ক জ্ঞান বৃদ্ধি আপনার সমস্যা সমাধানে ভুমিকা রাখতে পারে।

প্রজনন সমস্যার ব্যাপারে আপনি হতোদ্যম ও বিভ্রান্তিকর অবস্থার মুখোমুখি হলেও আপনাকে ইতিবাচক মনোভাব নিয়েই এগুতে হবে। অনেক ক্ষেত্রেই চিকিৎসক সমস্যার মূল খুঁজে সম্ভব্য সকল কৌশল প্রয়োগ করে আপনার সমস্যার সমাধান করে দিতে পারেন। সাধারণ পদক্ষেপ থেকে শুরু করে চিকিৎসা বিজ্ঞানের অনেক আধুনিক পদ্ধতির মাধ্যমে বর্তমানে সন্তান না হওয়া সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব হচ্ছে।

সন্তান স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার এক মজবুত সেতুবন্ধন, দাম্পত্য সম্পর্ক তাতে পুর্ণতা পায়। কিন্তু বন্ধ্যাত্বকে বলা হয় দাম্পত্য জীবনের অভিশাপের মতোন। কারণ কোন দম্পতির না শখ হয় একটি শিশু সন্তানের হাসি দেখার। তবু আমাদের চারপাশে অনেকেই বন্ধ্যাত্ব সমস্যায় ভোগেন।

বন্ধ্যাত্বের কারণগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ৪০ শতাংশ ক্ষেত্রে স্ত্রী, ৩৫ শতাংশ ক্ষেত্রে স্বামী এবং ১০-২০ শতাংশ ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের ত্রুটির জন্য গর্ভধারণ হয় না।বাকি ১০ শতাংশ ক্ষেত্রে অনুর্বরতার কোনো সঠিক কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না।যদিও আমাদের দেশে এখনো গর্ভধারণ না করার জন্য প্রথমেই মেয়েদের দায়ি করা হয়। সন্তান লাভের আশায় কোনো দম্পতি কোনো ধরনের জন্মনিরোধক উপায় অবলম্বন না করে এক বছর পরও যখন স্ত্রীর গর্ভধারণ হয় না তখন তাকে বলা হয় বন্ধ্যত্ব বা ইনফার্টিলিটি।

তবে এক্ষেত্রে আজকের চিকিৎসা বিজ্ঞান অনেক ধাপ এগিয়ে আছে। টেষ্টটিউব বেবি পদ্ধতি সম্পর্কে আজকাল কমবেশি সবার জানা।শরীরের ভেতরে ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর মিলনকে ডাক্তারি পরিভাষায় বলা হয় ইন ভিভো ফার্টিলাইজেশন, আর কৃত্তিম উপায়ে শরীরের বাইরে, পরীক্ষাগারে উপযুক্ত পরিবেশে এই নিষেক বা মিলন সফল হলেই তার নাম হলো ইনভিট্রো ফার্টিলাইজেশন সাধারণ মানুষের কাছে, যা টেষ্টটিউব বেবি পদ্ধতি নামে পরিচিত।

তবে বন্ধ্যাত্ব মানেই টেষ্টটিউব বেবি পদ্ধতি নয়। যে কোনো নিঃসন্তান দম্পতির ক্ষেত্রে বন্ধ্যত্বের কারণ শুধু স্বামী বা স্ত্রী প্রজনন অঙ্গের নানা ত্রুটি বা অসুখ নয়, আরো নানা বিষয় আছে যার কারণে বন্ধ্যত্ব হতে পারে। বয়স ৩৫-এর বেশি হলে, অস্বাভাবিক মোটা শরীর হলে, মানসিক কারণে শারীরিক মিলনে লজ্জা বা ভয়ও বন্ধ্যাত্বের কারণ হতে পারে।

বৈবাহিক জীবনে অশান্তি বা দ্বন্দ্বের জন্য শারীরিক সম্পর্ক অনিয়মিত বা সময়মত না হলে গর্ভসঞ্চার নাও হতে পারে। অনেক সময় স্বামীর কিছু রোগের (সিফিলিস, গনোরিয়া) কারণেও স্ত্রীর সন্তান ধারণক্ষমতা কমে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে।সেই সঙ্গে স্ত্রীর সেইরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। থাইরয়েড গ্রন্হির অসুখ অনুর্বরতার কারণ হতে পারে। মেয়েদের বন্ধ্যাত্বের জন্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে দায়ি ফ্যালোপিয়ন টিউবে বাধা, পলিসিষ্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম, ডায়াবেটিস ইত্যাদি।

পুরুষের বন্ধ্যত্বের অন্যতম কারণ সিমেনে উপযুক্ত পরিমাণে গতিশীল স্পার্মের অভাব। এছাড়াও পরিবেশ দুষণ, কায়িক পরিশ্রমের অভাব, অতিরিক্ত গরমে কাজ করা, স্মাম্পস, টাইফয়েড, আর্থাইটিস, হাইড্রোসিল ইত্যাদি অসুখে শুক্রাণুর উৎপাদন কমে গিয়ে দেখা দেয় বন্ধ্যাত্ব। সেই সঙ্গে অতিরিক্তি ধুমপানও বন্ধ্যত্বের কারণ হতে পারে। ঋতুকাল (পিরিয়ড), ডিম্ব নিঃস্বরন (ওভুলেশন) এবং নারীর গর্ভধারণ সম্পর্কিত কিছু কথা। জীবনের প্রতিটি দিনই পুরুষ শুক্রানু উৎপন্ন করতে পারে। পক্ষান্তরে নারী প্রায় ১০ থেকে ২০ লক্ষ্য ডিম্বানু নিয়ে জন্ম গ্রহন করে এবং তার অল্প কিছু মাত্র জীবনকালে অবমুক্ত করে।

আবহাওয়ার পার্থক্যভেধে নারীর ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সে প্রথম পিরিয়ড শুরু হয়। পিরিয়ড শুরু হবার সময়কালে মাত্র ৩ লক্ষ ডিম্ব সক্রিয় থাকে, তার পুর্বেই বেশিরভাগ ডিম্বানু নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। পরবর্তীতে প্রতি মাসিক ঋতুকালে মাত্র একটি ডিম্ব পরিপক্ক হয়ে ডিম্ব থলি থেকে নিঃস্বরীত হয়।

নিঃস্বরীত ডিম্বানু ফেলোপাইন টিউব (প্রজনন তন্ত্রের একটি অংশ) এর শেষ প্রান্তে এসে অবস্থান নেয়। পরবতীতে তা ক্রমশঃ গর্ভাশয়ের এর দিকে অগ্রসর হয়। তার এই যাত্রাপথে যদি কোন শুক্রানু দ্বারা ডিম্বটি নিষিক্ত হয় তবে তা গর্ভাশয়ে গিয়ে বসে যাবে। যাকে আমরা নারীর গর্ভধারন বলি। গর্ভাশয়ে পরবর্তীতে শিশুর জীবনকাল আরাম্ভ হয়।

আর যদি ডিম্বানুটি কোন পুরুষের শুক্রানু দ্বারা নিষিক্ত না হয়, তবে তা বিচূর্ন হয়ে কিছু রক্তকনিকা সহ মাসিক ঋতুচক্রের সময় নির্গত হয়ে যাবে

ডিম্ব নিঃস্বরন কিভাবে সনাক্ত করবেন?
গড়পড়তা প্রতি ঋতুচক্র ২৮ থেকে ২৯ দিন ব্যাপ্ত থাকে। যা পুর্ববতী ঋতুচক্রের প্রথম দিন থেকে শুরু করে পরবর্তী ঋতুচক্র শুরুর আগের দিন পর্যন্ত গনানা করা হয়। বেশিরভাগ নারীর মাসিক ঋতুচক্রের ১১তম থেকে ২১তম দিবসের মাঝের সময়ে ডিম্বাশয় থেকে পরিপক্ক ডিম্ব নিঃস্বরীত হয়। ডাক্তারী ভাষায় এই সময়কে নিষেক-কাল বলা হয়। কারন এই সময়ের মধ্যে যৌন মিলনের ফলে নারীর গর্ভধারনের সম্ভাবনা থাকে। যারা কোন প্রকার জন্মনিয়ন্ত্রন বড়ি বা ইনজেকশান ব্যবহার না করতে চান তারা এই সময়কালে মিলনে বিরতি দিয়ে গর্ভধারন থেকে মুক্ত থাকতে পারেন। একই ভাবে যেসকল যুগল সন্তান নিতে চান তারা এই সময়কালে বেশি বেশি মিলন করলে গর্ভধারনের সম্ভাবনা প্রকট থাকে। তবে মনে রাখবেন প্রতি মাসে একই সময়কালে ডিম্ব নিঃস্বরন নাও হতে পারে। National Institute of Environmental Health Sciences এক রিচার্স এ দেখা গেছে মাত্র শতকরা ৩০ ভাগ নারীর ঋতুচক্রের ১০ থেকে ১৭ তম দিবসের মাঝে ডিম্ব নিঃস্বরীত হয়েছে। তাই যারা এ সময় মিলনে বিরতি দিয়ে জন্মনিয়ন্ত্রন করতে চান তারা বিষয়টি অবশ্যই মাথায় রাখবেন। আপনি এই ঠিকানায় গিয়ে ফার্টিলিটি ট্রেকিং করতে পারেন।

ডিম্বানুর নিষেক সম্পর্কে কিছু তথঃ

  • ডিম্বাশয় থেকে নিঃস্বরনের পর প্রতিটি ডিম্বানু ১২ থেকে ১৪ ঘন্টা জীবিত থাকে।
  • প্রতিবার সাধরনত একটি ডিম্ব নিঃস্বরীত হয়।
  • ডিম্বানুর নিঃস্বরন মানসিক চিন্তা, অসুস্থতা অথবা ঋতুচক্রের দৈর্ঘ্য পরিবর্তনের সাথে সম্পর্কিত হতে পারে।
  • অনেক নারীর ডিম্ব নিঃস্বরেনের সময় যৎসামান্য রক্ত নির্গত হতে পারে।
  • নিঃস্বরনের পর নিষিক্ত ডিম্বানু ৬ থেকে ১২ দিনের মধ্যে গর্ভশয়ে স্থান নেয়।
  • ঋতুচক্রের রক্তক্ষরন ডিম্বানু নিঃস্বরন ব্যতিরিকেও হতে পারে।
  • ঋতুচক্রের রক্তক্ষরন ব্যতিরিকেও ডিম্বানু নিঃস্বরীত হতে পারে।

মাসিক ঋতুচক্রের বিভিন্ন দিকঃ
ঋতুচক্র হচ্ছে নারীর একটি ডিম্বানু নিষেক অথবা ক্ষরনের শারীরবিত্তিয় পরিবর্তনের চক্র। গড়পড়তা প্রতি ঋতুচক্র ২৮ থেকে ২৯ দিন ব্যাপ্ত থাকে। যা পুর্ববতী ঋতুচক্রের প্রথম দিন থেকে শুরু করে পরবর্তী ঋতুচক্র শুরুর আগের দিন পর্যন্ত গনানা করা হয়। তবে অনেক নারীর ঋতুচক্র মাত্র ২২ দিন (সর্বনিন্ম) এবং অনেকের ৩৬ দিন (সর্বচ্চ) পযন্ত ঋতুচক্র স্থায়ী হতে পারে। এমনকি একই নারীর ভিন্ন ভিন্ন মাসে ভিন্ন সময় ব্যাপ্তির ঋতুচক্র হতে পারে। ঋতুচক্রের ভিতর সাদা স্রাব (ভাজাইনাল ডিসচার্য) একটি স্বাভাবিক বিষয়। এই ক্ষরনের মাত্রা ইস্ট্রোজেন এবং প্রো-ইস্ট্রোজেন হরমনের লেভেল উঠা-নামার সাথে কম বেশি হতে পারে।

নারীর বয়স যত বাড়তে থাকে তত ঋতুচক্রের দৈর্ঘ্য (সময় ব্যাবধান) কমতে থাকে। আমাদের দেশে সাধারনত নারীদের ৫৫ থেকে ৫৬ বছর বয়সে ঋতুচক্র স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় অনেক নারী বসতে অথবা উঠতে মুত্র ধরে রাখতে পারেন না এবং ক্ষানিক মুত্র বিসর্জন করে ফেলেন। এটি একটি স্বাভাবিক বিষয়। অনেকে এটি না জানার কারনে চিন্তিত হয়ে ডাক্তারের সরনাপন্ন হন – যার আধৌ প্রয়োজন নেই।

ইনফার্টিলিটি সমস্যা ও প্রতিকার
সন্তান লাভের আশায় কোনো দম্পতি কোনো প্রকার গর্ভনিরোধক উপায় অবলম্বন না করে এক বছর স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবন যাপনের পরও যখন স্ত্রীর গর্ভসঞ্চার না হয় তখন তাকে বন্ধ্যাত্ব বলা হয়। সন্তান স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যকার এক মজবুত সেতুবন্ধন, দাম্পত্য জীবন তাতে পূর্ণতা পায়। দেখা গেছে যে ৬ মাস একাধারে সহবাসের পর শতকরা ৫০ ভাগ ক্ষেত্রে এবং এক বছর পর শতকরা ৯০ ভাগ মহিলা গর্ভধারণ করে থাকে। স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবন অতিবাহিত করার এক বছরের মধ্যে সন্তান সম্ভাবনা না ঘটলে ত্রুটি স্বামী বা স্ত্রী অথবা উভয়েরই থাকতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বের সমগ্র জনসংখ্যার ৮-১০ ভাগ দম্পতি কোনো না কোনো রকমের বন্ধ্যাত্বের সমস্যায় ভুগছে। বাংলাদেশে এর সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও ধারণা করা হয় এই সংখ্যা একই রকম হবে।
বন্ধ্যাত্বের কারণগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে ৪০ শতাংশ ক্ষেত্রে স্ত্রী, ৩৫-৪০ শতাংশ ক্ষেত্রে স্বামী এবং ১০-২০ শতাংশ ক্ষেত্রে উভয়েরই ত্রুটির জন্য গর্ভধারণ হয় না। বাকি ১০ শতাংশ ক্ষেত্রে বন্ধ্যাত্বের কোনো সঠিক কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না।

পুরুষের ক্ষেত্রে বন্ধ্যাত্বের কারণ
পুরুষের বন্ধ্যাত্বের অন্যতম কারণ বীর্যে উপযুক্ত পরিমাণে গতিশীল শুক্রাণুর (সপার্ম) অভাব। পুরুষের ক্ষেত্রে বন্ধ্যাত্বের কারণকে তিনটি মূল ভাগে ভাগ করা যায়।
শুক্রাণুর উৎপাদন সমস্যা, যা হতে পারে গুণগত বা সংখ্যাগত
উৎপাদিত মানসম্পন্ন শুক্রাণু নিঃসরণে অক্ষমতা
ইমিউনোলজিক্যাল সমস্যা। কিছু কিছু ক্ষেত্রে জন্মগত ত্রুটি যেমন-শুক্রাশয় শুক্রথলিতে না থাকলে বন্ধ্যাত্ব হতে পারে।
পুরুষের ক্ষেত্রে বন্ধ্যাত্বের আর একটি অন্যতম কারণ হলো ইনফেকশন। মাসপস, ইনফ্লুয়েঞ্জা, গনোরিয়া, যক্ষ্মা ইত্যাদি পুরুষের বন্ধ্যাত্বের কারণ হতে পারে। এছাড়া অতিরিক্ত গরম পরিবেশে কাজ করা, গরম পানিতে গোসল করা অথবা নাইলনের তৈরি অন্তর্বাসের ব্যবহার শুক্রাণু তৈরির প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে, কারণ শুক্রাণু তৈরির উপযুক্ত তাপমাত্রা এতে বজায় থাকে না। অতিরিক্ত ধূমপান, অ্যালকোহল সেবন, মাদকদ্রব্য যেমন-কোকেইন সেবন, কোনো কোনো ব্লাড প্রেসারের ওষুধ যেমন নিফিডিপিন শুক্রাণুর ডিম্বাণু নিষিক্তকরণ ক্ষমতাকে নষ্ট করে দেয় এবং বন্ধ্যাত্বের কারণ হিসেবে দেখা দেয়।
এছাড়া পুরুষের ক্ষেত্রে হরমোনজনিত সমস্যা এবং জেনেটিক সমস্যাও বন্ধ্যাত্বের কারণ হতে পারে।

মহিলাদের ক্ষেত্রে বন্ধ্যাত্বের কারণ
ডিম্বাশয়ের ডিম্বাণু তৈরির জটিলতা মেয়েদের বন্ধ্যাত্বের অন্যতম কারণ। দেখা গেছে, ২০-২৫ শতাংশ ক্ষেত্রে এই সমস্যা মেয়েদের বন্ধ্যাত্বের জন্য দায়ী। এছাড়া থাইরয়েড গ্রন্থির অসুখ, পলিসিস্টিক ওভারি বা ওভারির সিস্ট, ডায়াবেটিস ইত্যাদি বন্ধ্যাত্বের কারণ হতে পারে ? মেয়েদের প্রজননতন্ত্রের জন্মগত ও গঠনগত ত্রুটি, ফ্যালোপিয়ন টিউবে বাধা, এন্ড্রোমেট্রিওসিস, অধিক পরিমাণে প্রলেকটিন হরমোন তৈরি, জরায়ুর ইনফেকশন, জরায়ুর টিউমার অনুর্বরতার কারণ হিসেবে চিহ্নিত।
শুধু স্বামী বা স্ত্রীর প্রজনন অঙ্গের নানা ত্রুটি বা অসুখ নয়, আরো নানা বিষয় আছে যার কারণে বন্ধ্যাত্ব হতে পারে। যেমন বয়স, যা পুরুষের চেয়ে মেয়েদের ক্ষেত্রে অধিক প্রযোজ্য। মেয়েদের বেলায় ২৫-৩০ বছর বয়স সন্তান জন্মদানের উপযুক্ত সময়। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ্যাত্বের সমস্যাগুলো জটিল হয়। যত বয়স বাড়তে থাকে ডিম্বাণুর সংখ্যা তত কমতে থাকে। এই ডিম্বাণু হ্রাসের প্রক্রিয়া শুরু হয় ত্রিশ বছর বয়স থেকে এবং ডিম্বাণু হ্রাসের প্রক্রিয়া দ্রুত হয় চল্লিশের কাছাকাছি বয়সে। বয়সের সঙ্গে ডিম্বাণুর কোয়ালিটি নষ্ট হতে থাকে, সেই সঙ্গে দেখা দেয় জেনেটিক নানা ত্রুটি। কাজেই বিবাহিত মহিলাদের ক্ষেত্রে বয়স ৩৫-এর কাছাকাছি হলে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা উচিত।
বয়স ছাড়াও স্বামী বা স্ত্রীর শরীর অস্বাভাবিক মোটা হলে মানসিক কারণে শারীরিক মিলনে লজ্জা বা ভয় বন্ধ্যাত্বের কারণ হতে পারে। বৈবাহিক জীবনে অশান্তি বা দ্বন্দ্বের জন্য শারীরিক সম্পর্ক অনিয়মিত বা সময়মতো না হলে গর্ভসঞ্চার নাও হতে পারে।

বন্ধ্যাত্বের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা
পুরুষের ক্ষেত্রে সিমেন (বীর্য) পরীক্ষা অত্যন্ত জরুরি। সিমেন পরীক্ষার রিপোর্ট যদি স্বাভাবিক থাকে তাহলে স্বামীর উল্লেখযোগ্য কোনো সমস্যা নেই বলা যেতে পারে। মূলত সিমেনে উপযুক্ত পরিমাণে গতিশীল সপার্মের অভাবই পুরুষের ক্ষেত্রে বন্ধ্যাত্বের প্রধান কারণ। যদি সিমেন পরীক্ষায় ইনফেকশনের লক্ষণ থাকে তাহলে অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে চিকিৎসা দরকার হয়। এছাড়া ধূমপান, অ্যালকোহল হতে বিরত থাকা, ওজন কমানো, ডায়াবেটিস এবং হাইপারটেনশন নিয়ন্ত্রণ রাখা ইত্যাদি সন্তান উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। সর্বোপরি সুস্থ জীবন-যাপন বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসার জন্য সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
বীর্যে শুক্রাণুর সংখ্যা কম থাকলে ওটও একটি উপযুক্ত পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে ডিম্বাণু নিঃসরণের সময়ে জরায়ুর ভেতরে স্বামীর বীর্য বিশেষভাবে প্রসেসিংয়ের পর সূক্ষ্ম ক্যাথেটারের মাধ্যমে দিয়ে দেয়া হয়।
তবে শুক্রাণুর সংখ্যা ৫ মিলিয়নের নিচে বা শুক্রাণুর গঠনগত ত্রুটি থাকলে বা নড়াচড়া কম থাকলে ইকসি (ICSI) দরকার হয়। ইকসি পদ্ধতিতে একটি ডিম্বাণুর মধ্যে একটি সুস্থ শুক্রাণু ইনজেকশনের মাধ্যমে প্রবেশ করিয়ে ডিম্বাণু নিষিক্ত করা হয়। যেসব পুরুষের ক্ষেত্রে বীর্যবাহী নালিতে বাধা থাকে তাদের বেলায় সার্জিক্যাল পদ্ধতির মাধ্যমে (MESA, TESA, PESA-এর মাধ্যমে) শুক্রাণু সংগ্রহ করে ইকসি করা যায়। পুরুষের বন্ধ্যাত্বের ক্ষেত্রে ইকসি অত্যন্ত উন্নত ধরনের চিকিৎসা এবং এই চিকিৎসাব্যবস্থা সব সেন্টারে থাকে না।
পুরুষের ক্ষেত্রে যেমন সিমেন পরীক্ষা জরুরি, তেমনি মেয়েদের ক্ষেত্রে বিভিন্ন হরমোন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে ডিম্বাশয়ের জটিলতা তথা প্রতি মাসে ডিম্বাশয় হতে ডিম্বাণু নিঃসরণ হচ্ছে কিনা তা নির্ণয় করা হয়।

লিখেছেনঃ

গাইনী, প্রসূতি ও বন্ধ্যাত্ব রোগ বিশেষজ্ঞ ও সার্জন

ডাঃ ফারজানা মাকসুরাত

এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য), এফসিপিএস (গাইনী ও অবস)

প্রতিদিন দুপুর ২.৩০টা-৫টা পর্যন্ত (শুক্রবার ব্যাতিত)
সিরিয়ালঃ +৮৮০ ১৭৮৩ ৮১৮ ৪৩০
সাভার কেয়ার হাসপাতাল

Leave a Reply

Close Menu